লোডশেডিং করে সাশ্রয়ী কর্মসূচির পরও গ্যাস-বিদ্যুতের দাম বাড়াতে চাইছে বাংলাদেশ সরকার

বাংলাদেশে গ্যাসসহ জ্বালানি সংকটের কারণে যখন বিদ্যুতের লোডশেডিং করা হচ্ছে, সেই পটভূমিতে গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম আবার বাড়াতে চাইছে দেশটির সরকার।

 

জ্বালানি ও বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ আজ শুক্রবার ঢাকায় এক প্রেস ব্রিফিংয়ে এমন ইঙ্গিত দিয়েছেন।

তিনি বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, আন্তর্জাতিক খোলাবাজারে গ্যাসের চড়া দামের কারণে ব্যয় এবং সরকারি ভর্তুকি বৃদ্ধি পাচ্ছে। সেজন্য দেশের রিজার্ভের ওপর চাপ বাড়ছে।

সেকারণে তারা গ্যাস এবং বিদ্যুতের দামের সমন্বয় করতে চাইছেন।

এদিকে, ভোক্তাদের অধিকার নিয়ে আন্দোলনকারী সংগঠন ক্যাব বলছে, গ্যাস সরবরাহে রেশনিং এবং বিদ্যুতের লোডশেডিং করার পরও দাম বাড়ানো হলে তা ন্যায়সঙ্গত হবে না।

মাস খানেক আগেই গ্যাসের দাম প্রায় ২৩ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে।

পাইকারি পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম প্রায় ৫৮ শতাংশ বাড়ানোর সরকারি প্রস্তাব নিয়ে এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের উদ্যোগে ইতোমধ্যেই গণশুনানি হয়ে রয়েছে।

গত মে মাসে অনুষ্ঠিত সেই শুনানিতে ক্যাব এবং ব্যবসায়ী ও শিল্পপতিদের সংগঠনগুলো তীব্র বিরোধিতা করেছিল বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর প্রস্তাবের।

সেই শুনানির পর কর্তৃপক্ষ এখনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেয়নি।

এরই মাঝে গ্যাসসহ জ্বালানি সংকটের কারণে কয়েক সপ্তাহ ধরে বিদ্যুৎ উপাদন কমিয়ে সারাদেশে লোডশেডিং করা হচ্ছে।

এমন পটভূমিতেই বিদ্যুৎ এবং গ্যাসের দাম বাড়ানোর ইঙ্গিত দিলেন জ্বালানি ও বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ।

দাম বাড়ানোর পক্ষে যুক্তি কী
প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ ইউক্রেন যুদ্ধের জেরে বিশ্ববাজারে গ্যাসের দাম বৃদ্ধি এবং দেশের রিজার্ভের ওপর চাপের বিষয়কে এর কারণ হিসাবে উল্লেখ করেন।

এর ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে তিনি বিদ্যুৎ উৎপাদনের খরচের বিষয় তুলে ধরে জানান, বিদেশ থেকে গ্যাস আমদানিতে প্রতি ইউনিটের দাম হয় ২৮টাকা। বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য সেই গ্যাস প্রতি ইউনিট পাঁচ টাকায় দিতে হচ্ছে।

এরপর বিদ্যুৎ উৎপাদন করে প্রতি ইউনিটের দাম পড়ছে আট টাকা। সেই বিদ্যুৎ সাত টাকা এবং কোন কোন ক্ষেত্রে দুই টাকা ৭৫ পয়সায় বিক্রি করতে হচ্ছে। ফলে, সেখানে বড় অংকের ভর্তুকি দিতে হচ্ছে বলে প্রতিমন্ত্রী উল্লেখ করেন।

“ইউক্রেন যুদ্ধের পরে এই ভর্তুকির পরিমাণ অত্যাধিক বেড়ে গেছে। জ্বালানির জন্য যেখানে আমরা চার বিলিয়ন ডলার খরচ করতাম, সেটা এখন দাঁড়িয়েছে নয় বিলিয়ন ডলারে।

“আরেকটা হচ্ছে, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর বড় চাপ পড়ছে। সেকারণে আমরা মনে করছি, বিদ্যুত ও গ্যাসের দামের সমন্বয় করা উচিত,” বলেন প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ।

তিনি উল্লেখ করেন, তারা অন্তত শিল্পকারখানা এবং বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে গ্যাস সরবরাহের দাম সমন্বয় করতে চান।

গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর চিন্তার ক্ষেত্রে সরকারের পক্ষ থেকে মূলত বড় অংকের ভর্তুকি কমানোর কথা বলা হচ্ছে।

সরকারি হিসাবেই দেখা যায়, গত ১২ বছরে দফায় দফায় দাম বাড়ানোর কারণে গ্রাহক পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম ৯০ শতাংশ বেড়েছে।

ঢাকার রামপুরা এলাকা থেকে একজন সাবেক স্কুল শিক্ষক মাহবুব আকতার বলছিলেন, নিত্য প্রয়োজনীয় সব পণ্যের উর্ধ্বমুখী বাজার পরিস্থিতির মুখে তিনি সংসার চালাতে হিমশিম খাচ্ছেন।

এখন আবার গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হলে তাদের জীবন যাত্রায় এর চাপ আরও বাড়বে।

Load Shedding

‘সাশ্রয়ী পদক্ষেপের পরও দাম বাড়ানো অন্যায়’

ভোক্তা অধিকার নিয়ে আন্দোলনকারী সংগঠন ক্যাব-এর সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট শামসুল আলম বলেছেন, ইউক্রেন যুদ্ধ এবং আন্তর্জাাতিক খোলাবাজারে চড়া দামের কথা বলে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি আমদানি বন্ধ রাখা হয়েছে।

এখন দেশে গ্যাস রেশনিং করে বিদ্যুৎ উৎপাদন কমিয়ে ১০ থেকে ১২ শতাংশ লোডশেডিং করার মাধ্যমে অনেক অর্থের সাশ্রয় করা হচ্ছে। এরপরও দাম বৃদ্ধির চিন্তা যুক্তিসঙ্গত নয় বলে মি: আলম মনে করেন।

“সাশ্রয়ী পদক্ষেপের পরও গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হলে তাতে ভোক্তাদের প্রতি চরম অবিচার করা হবে,” বলেন ক্যাবের কর্মকর্তা শামসুল আলম।

 

সরকারের জবাব

যখন খোলাবাজার থেকে এলএনজি আমদানি বন্ধ রাখা হয়েছে এবং গ্যাস রেশনিং করে বিদ্যুৎ উৎপাদন কমিয়ে অর্থের সাশ্রয় করা হচ্ছে, এরপরও দাম বাড়ানোর পরিকল্পনা কেন করা হচ্ছে?

এই প্রশ্ন করা হলে প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বিদ্যুৎ কেন্দ্র বা এর অবকাঠামোর পেছনে ব্যয়ের কথা তুলে ধরেন।

“বিদ্যুত উৎপাদন অনেক কেন্দ্রে বন্ধ রাখা হয়েছে। কিন্তু বিদ্যুত কেন্দ্রগুলোতো রয়েছে। এসব অবকাঠামোর খরচ আছে। সেটা আমাকে বসে বসে দিতে হচ্ছে। সেটাতো আপনাকে চিন্তা করতে হবে,” বলেন নসরুল হামিদ।

“শিল্পকারখানা বা গার্মেন্টসতো বন্ধা রাখা যায় না। সেখানে আমাকে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস দিতে হবে।

“সেই গ্যাস দেশের ভেতর থেকে হোক বা আমদানি করে হোক, আমরা দিতে চাই। সেজন্যই আমাদের দাম সন্বয় করতে হবে,” বলেন জ্বালানি ও বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী।

তবে কনজ্যুমারস এসোসিয়েশন বা ক্যাবের কর্মকর্তারা বলেছেন, গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম বাড়াতে হলে আবার গণশুনানি করা প্রয়োজন।

গণশুনানি না করে একতরফাভাবে দাম বাড়ানো হলে তাতে সংকট বাড়বে বলেই তারা মনে করছেন।

 

Source : BBC

Leave a Reply

Your email address will not be published.