fbpx

Desh Amar

Online news Portal

শিল্পনগরী খুলনা এখন ক্যানভাসের নগরীতে পরিণত হয়েছে। ভোর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত চলছে নানা ধরনের মাইকিং। প্রচার যন্ত্রের যথেচ্ছ ব্যবহারে অ’তিষ্ঠ নগরবাসী। আর এনিয়ে ক্ষোভ তৈরী হয়েছে নগরবাসীর মধ্যে। ইতিমধ্যে এর প্রতিবাদে নিরালা আবাসিক এলাকায় মাইকিং বন্ধে ব্যবস্থাও নিয়েছে এলাকাবাসী। ভোর থেকে আলু, পিঁয়াজ বিক্রি থেকে ভিক্ষাবৃত্তিতেও ব্যবহার হচ্ছে মাইক। ভিক্ষা করতে এখন আর কেউ মুখ দিয়ে ভিক্ষা চান না। আধুনিক ভাষায় ভিক্ষার শ্লোগান রেকর্ড করে মেমোরি কার্ডে ভরে মাইকে প্রচার করে ভিক্ষা চাওয়া হয়।

আর নগরীর খাবার দোকান থেকে শুরু করে সব ধরনের পণ্যের বিজ্ঞাপন প্রচারে ব্যবহার হচ্ছে মাইক। নেই কোন বাধা কিংবা প্রতিবাদ। অনেকে বির’ক্ত হয়ে ঘরের জানালা দরজা বন্ধ রেখে শি’শুদের লেখাপড়া করাচ্ছেন। ঘরে অ’সুস্থ কেউ থাকলে তাদের সমস্যা আরো বেশী। অনেক সময় বৃদ্ধ অ’সুস্থ হৃদরোগের রোগীদের জন্য শব্দদূষণ বাড়তি ঝুঁ’কি তৈরী করছে।

এ বিষয়ে নগরীর আজাদ লন্ড্রীর বাসিন্দা মোহাম্ম’দ আলী বাবু বলেন, আমাদের খুলনাকে আধুনিক স্বাস্থ্য-সম্মত নগরী হিসেবে গড়ে তুলতে চাওয়া হয় কিন্তু তা’ করতে হলে শব্দদূষণ এর দিকে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নজর দিতে হবে। তিনি বলেন, সকাল থেকে রাত পর্যন্ত যত্র-তত্র যখন-তখন মাইক বাজছে এর উচ্চ শব্দ সব বয়সী মানুষের উপর ক্ষতিকর প্রভাব ফেলছে।

বিশেষ;জ্ঞদের মতে শব্দ দূষণের কারণে অনেক মানুষের শ্রবণশক্তি হ্রাস পেয়েছে বলে উঠে আসে সাম্প্রতিক এক জ’রিপে। বাংলাদেশে শব্দ দূষণ নিয়ন্ত্রণ বিধিমালায় স্পষ্ট বলা আছে কোন এলাকায়, দিনের কোন সময়ে, কি ধরনের শব্দ আইনত দ-নীয় অ’প’রা’ধ। শব্দ দূষণকে বলা হয় নীরব ঘা’ত’ক। শব্দ দূষণের বহু উৎস রয়েছে যা জনস্বাস্থ্যের জন্য হু’মকি। গাড়ির হর্ন, নির্মাণকাজ, মাইকের ব্যবহার, শিল্পকারখানা কোন ক্ষেত্রেই শব্দ দূষণ বিষয়ে যেসব নিয়ম রয়েছে তা মানা হচ্ছে না।

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ের শব্দদূষণ (নিয়ন্ত্রণ) বিধিমালা ২০০৬ অনুযায়ী আবাসিক এলাকায় রাত ন’টা থেকে ভোর ছ’টা পর্যন্ত শব্দের মাত্রা ৪৫ ডেসিবেল এবং দিনের অন্য সময়ে ৫৫ ডেসিবেল অ’তিক্রম করতে পারবে না। বাণিজ্যিক এলাকায় তা ৬০ থেকে ৭০ ডেসিবেল। হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, অফিস-আ’দা’লতের আশপাশে ১০০ মিটার পর্যন্ত নীরব এলাকা হিসেবে ঘোষণা করা রয়েছে। সেখানে রাতে ৪০ ও দিনে ৫০ ডেসিবেল শব্দ মাত্রা নির্ধারণ করে দেয়া আছে। তবে এর কোনটাই মানা হচ্ছে না।

এ বিষয়ে খুলনা মেডিকেল কলেজের সহকারী অধ্যাপক এস এম ফরিদ উজ্জামান বলেন, একটি নির্দিষ্ট ডেসিবেল এর বেশী শব্দ হলে মানুষের মধ্যে বির’ক্তি তৈরী হয় যা তার মনের উপর বিরূপ প্রভাব ফেলে। এর ফলে তার মন মেজাজ খা’রা’প হয়ে উ’ত্তে’জ’না তৈরী করে এবং মানসিক স্বস্তি নষ্ট হয়। যার প্রভাব পড়ে তার পরিবার ও সমাজের উপর। তিনি বলেন, বর্তমানে যানবাহনের শব্দ ও হর্নের সাথে বাড়ছে সামাজিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক, ধ’র্মীয় প্রতিটি অনুষ্ঠানের শব্দ দূষণ এর সাথে যোগ হয়েছে যথেচ্ছ ক্যানভাস। এখনই যদি এর নিয়ন্ত্রনে ব্যবস্থা না নেওয়া হয় শব্দ দূষণ সমাজ ও মনোজগতে বিরূপ প্রভাব ফেলবে।

খুলনা বিশ^বিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. দিলিপ কুমা’র দত্ত বলেন, শব্দ আসলে একটা মানুষকে অ’সুস্থ করে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। তিনি বলেন, শব্দ দূষণ মানুষের মনের উপর সরাসরি প্রভাব ফেলে এবং তার যে কোন বিষয়ের উপর মনোযোগ নষ্ট করে, যার ফলে কাজের পাশাপাশি মনের উপরও ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে যা মনোরোগের কারণ হতে পারে। তিনি বলেন, যেহেতু পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ের শব্দদূষণ (নিয়ন্ত্রণ) বিধিমালা রয়েছে এ বিষয়ে পরিবেশ অধিদপ্তর যদি যথাযথ পদক্ষেপ নেয় তবে এর নিয়ন্ত্রণ সম্ভব।

শব্দ দূষণ বিষয়ে পরিবেশ অধিদপ্তরের খুলনা বিভাগীয় কার্যালয়ের পরিচালক সাইফুর রহমান খানের সাথে যেগাযোগ করলে তিনি বলেন, “এবিষয়ে তার কাছে এই মুহূর্তে কোন তথ্য নেই।” খুলনা পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী বায়ো কেমিষ্ট, নরেশ চন্দ্র বিশ^াস জানান, “খুলনায় নিয়মিত শব্দের মান পরীক্ষা করা হয়। বিস্তারিত জানতে চাইলে বলেন নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ জমা দিয়ে আবেদন করলে তথ্য পাওয়া যাবে।”

খুলনা রূপসা শিরগাতি গ্রামের অন্ধ মোজাম শেখ মাইক কিনেছেন ২২’শ টাকা দিয়ে ভিক্ষা করার জন্য। মাইকে বাজছে, “ও মা’রা বাবারা আমা’র দুইডা চক্ষু নাই, বাবারা আপনাদের সামনে হাত পাতছি, বাবারা আল্লার রওয়াস্তে সাহায্য করুন বাবারা।” আয় ভালো স্ত্রী’কে নিয়ে হেঁটে হেঁটে মাইকিং করে দৈনিক ভিক্ষা করে পান ৫’শ থেকে ৭’শ টাকা।

খুলনার গোবরচাকা মধ্যপাড়ার মোঃ মিন্টুর ভ্যানের মাইকে সারাদিন বাজতে থাকে “বিসমিল্লাহির রহমানির রাহিম। আমির ভাইয়ের ইঁদুর মা’রা মহা বিষ টোপ। জি হ্যা পথচারি ভাই বন্ধু এই সেই বিখ্যাত আমির ভাইয়ের ইদুর মা’রা মহা বিষ টোপ। যা ব্যবহারে আপনার ঘরের ইঁদুর, তেলাপোকা, উইপোকা, পিপড়া, ছারপোকা, মা’থার উকুন, গরুর আঁঠালি মা’রতে পারবেন। তিন প্যাকে মাত্র কুড়ি টাকা।” মিন্টু জানান, প্রায় ৩০ বছর ধরে তিনি এভাবেই বিক্রি করছেন। তিনি জানান, দিনে এক থেকে দুই হাজার টাকা বিক্রি হয়।

নরগীতে অধিকাংশ ইলেকট্রোনিক্স দোকানে মাইক এখন নিয়মিত একটি বিক্রি হয় বলে জানান খুলনার ব্যবসায়ীরা। দামও অনেক কমেছে। খুলনার আশা ইলেকট্রোনিক্স এর দায়িত্বে থাকা আশিক রহমান বলেন, তাদের কাছে সব ধরনের মাইক ও স্পিকার পাওয়া যায়। যার অধিকাংশই ভা’রত ও চায়না থেকে আসে। তিনি জানান, বর্তমানে হকার ও ভিক্ষুকদের কাছে হ্যান্ড মাইকের চাহিদা বেশী। দাম ৮’শ থেকে ২৫’শ পর্যন্ত বিভিন্ন সাইজের পাওয়া যায়।

নগরবাসী অ’তিষ্ঠ হলেও প্রতিকারে নেই কোন উদ্যোগ। এ বিষয়ে খুলনা সিটি ল’কলেজের শিক্ষক নাগরিক নেতা এ্যাড. কুদরত-ই-ক্ষুদা বলেন, নগরীতে শব্দ দূষণ এখন মানুষের কাছে আতঙ্কের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তিনি বলেন, এ বিষয়ে আম’রা নাগরিক সমাজের পক্ষ থেকে পরিবেশ অধিদপ্তর, সিটি কর্পোরেশন ও পু’লিশ প্রশাসনকে জানিয়েছি তবে কোন প্রতিকার হয়নি। তিনি বলেন, এগুলো নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে আম’দানি বন্ধ করতে হবে। তাহলেই এর ব্যবহার কমতে পারে। না হলে যেভাবে শব্দ দূষণ চলছে তাতে আগামী প্রজন্ম প্রতিবন্ধিতে পরিণত হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *