নতুন বোতলে পুরোনো তা’লেবানই ফিরে এলো?

নতুন বোতলে পুরোনো তা’লেবানই ফিরে এলো?

ঝড় আসবার আগে প্রকৃতি থাকে শান্ত, নিস্তব্ধ। কিন্তু ঝড়ের তা’ণ্ড’ব যখন শুরু হয়, কোনো কিছুই সে ঝড়ের হাত থেকে রেহাই পায় না। বর্তমান আ’ফ’গা’নিস্তানের অবস্থাও আম’রা ঠিক তেমনই দেখতে পাচ্ছি। যেখানে গণতন্ত্রের বালাই নেই, মূল্যবোধের চর্চা নেই। ঝড়ের মতোই অ’স্ত্রের মুখে দেশের সরকারকে কব্জা করে, লেজ গুটিয়ে পালাতে বাধ্য করে তারা ঘোষণা করেছে ই’স’লা’মিক আমিরাতের (আ’ফ’গা’নিস্তানের নতুন নাম দিয়েছে তা’লেবানরা) নয়া উত্থান। এখন তারা সবকিছু চুপচাপ দেখে যাচ্ছে। অ’পেক্ষা করছে আন্তর্জাতিক দেশগুলোর স্বীকৃতির। ইতোমধ্যে চীন, রাশিয়া, তুরস্ক এবং পা’কিস্তানের সবুজ সঙ্কেত তাদের ঝোলায় চলেও এসেছে। মা’র্কিন প্রশাসনও সেদিকেই যাচ্ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এখন শুরু হবে এক বিশ্বব্যাপী নতুন তা’লেবান ঝড়।

আম’রা দেখেছি আ’ফ’গা’ন সে’নাবাহিনীর অসহায় আত্মসম’র্পণ। দেখেছি কাবুল এয়ারপোর্টে শত সহস্র মানুষের ভিড়। দেখেছি প্লেনের চাকায় করে দেশ ছাড়তে চাওয়া অবুঝ যুবকের অকালে মৃ’ত্যুবরণ। শুনতে পাচ্ছি এয়ারপোর্টে প্র্যামে শুয়ে থাকা মা-বাবাহীন সাত মাস বয়েসী অবুঝ শি’শুর কা’ন্না। শুনতে পেয়েছি কি’শোরী আর যুবতীদের হ্রদয়ের র’ক্তক্ষরণ। তারা এখন পড়াশোনা করতে পারবে কিনা, কেউ জানে না। রঙিন একটা স্বপ্ন এতদিন ধরে যে বুকের মাঝে তারা লালন করে এসেছিল, তা কেউ জানে না। দেশটি আবার আগের মতো বর্বরতার দিকে যাচ্ছে কিনা, তা কেউ জানে না।

এত কিছু আসলে কীসের বিনিময়ে?

গত ১৫ আগস্ট বিশ্ব রাজনীতির প্রেক্ষাপটে ঘটে গেলো এক অবিস্ম’রণীয় ঘটনা। একের পর প্রদেশ দখল করে তা’লেবান যোদ্ধারা কফিনে শেষ পেরেক ঠুকে দেয়ার মতো দখল করে নিলো রাজধানী কাবুল। ন্যূনতম প্রতিরোধ গঠন করতে পারলো না এতদিনকার গড়ে ওঠা আ’ফ’গা’ন বাহিনী। বলতে গেলে প্লেটে করে সাজিয়ে দেয়ার মতোই তারা দেশটিকে তুলে দিলো আ’ফ’গা’নদের হাতে। ইতিহাসের রাজা লক্ষ্মণ সেনের মতোই লেজ গুটিয়ে পালিয়ে গেলেন প্রেসিডেন্ট আশরাফ গনি, খোঁড়া যু’ক্তি দিয়ে বললেন যে র’ক্তপাত এড়াতেই দেশ ছেড়ে তিনি চলে গিয়েছেন। মা’র্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন বললেন আ’ফ’গা’নরাই তাদের দেশরক্ষার ভা’র ঠিকভাবে বইতে পারেনি।

এরপর আম’রা দেখতে পেলাম তা’লেবানদের স্বভাবচরিত্রের মাঝে যেন কিছুটা পরিবর্তন এসেছে। গতকাল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ভিডিও ভাই’রাল হয়েছে। সে ভিডিওতে আম’রা দেখতে পেয়েছি বাচ্চাদের মতো তারা উচ্ছ্বল হয়ে উঠেছে। দোলনায় চড়ছে, হাসিঠাট্টা করছে। তখন আমাদের একটু ধন্দে পড়তে হয়। এ আবার কোন তা’লেবান দেখতে পাচ্ছি আম’রা?

র’হ’স্যের গন্ধটা ধীরে ধীরে ব্যাপনাকারে আরেকটু ঘনীভূত হয়, যখন আম’রা দেখতে পাই আ’ফ’গা’নিস্তানের জাতীয় টেলিভিশনে তা’লেবান মিডিয়া টিমের এক সদস্যের সাক্ষাৎকার নিচ্ছে। এমনকি ২০ বছর আগের তা’লেবান আর এই তা’লেবানের মাঝে আকাশ-পাতাল ফারাক। ২০ বছর আগের তা’লেবান ছিল না’রীদের প্রতি অ’ত্যন্ত নি’র্ম’ম এবং কঠোর। কঠোর পর্দাপ্রথার মাঝেও ছিল কঠোর পর্দাপ্রথা। না’রী অধিকার কিংবা তাদের কথা বলারও কোনো মূল্য ছিল না। আর এখনকার তা’লেবানদের আম’রা দেখতে পাচ্ছি না’রীদেরকে তাদের গঠিত সরকারে শরীক হবার জন্য। শরীয়াহমতো তারাও চাচ্ছে না’রীরা যেন সরকার গঠনে অংশগ্রহণ করে। এটি দেখে আম’রা আবারও ধন্দে পড়ে যেতে বাধ্য হই।সবচেয়ে বড় খট’কা’টা লাগে তখন, যখন আম’র জানতে পারি যে এই তা’লেবানরা বলছে না’রীদের বোরকা পরা বাধ্যতামূলক নয়, তবের ঘরের বাইরে অবশ্যই তাদের হিজাব পরিধান করতে হবে। এই তা’লেবান আসলে চাচ্ছে কী?

পূর্বের যে তা’লেবানকে আম’রা চিনি, তারা কঠোর, নি’র্ম’ম এবং বুনো। সভ্যতার ধার তারা ধারে না, বর্তমান বিশ্বব্যাপী গণতন্ত্রের যে চর্চা হচ্ছে, সে চর্চা তারা মানে না। পূর্বের তা’লেবান অ’স্ত্রের মুখে সবকিছু দখল করতে চাইতো, মানুষের বেঁচে থাকার স্বাভাবিক যে অধিকারগুলো প্রয়োজন হয়, সেগুলো কেড়ে নিতে চাইতো। না’রীদের কঠোর পর্দাপ্রথার মাধ্যমে ঘরের ভেতর বন্দী করে রাখতে চাইতো। পড়াশোনা কিংবা অন্যকোনো কাজে না’রীদের শরীক করতে চাইতো না। যৌ’নদাসী হিসেবে না’রীদের ব্যবহার করতো অহরহ। কিন্তু বর্তমানের যে তা’লেবান আম’রা দেখতে পাচ্ছি, এই তা’লেবান না’রীদের স্নাতক পর্যায় পর্যন্ত পর্দাপ্রথার মধ্যে থেকে পড়াশোনার সুযোগ দিচ্ছে। তবে অবশ্যই সেটা তাদের শরীয়াহ-এর মধ্যে হতে হবে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, নতুন বোতলে পুরোনো ম’দ হিসেবে তা’লেবানরা আসলে শরীয়াহভিত্তিক প্রথা হিসেবে কী নিয়ে আসতে চাইছে? তাদের কাঠামো ব্যবস্থাটা কী হতে যাচ্ছে, তা নিয়ে শুরু হয়েছে জল্পনা-কল্পনা। না’রীদের অধিকার দেয়া নিয়ে তা’লেবানরা এখন কথা বলছে। বলছে তারা এখন আর আগের মতো বর্বর ব্যবহারের মধ্যে থাকবে না।

এই তা’লেবান অনেক স্থিতিশীল, অনেক রক্ষণশীল পূর্বের চেয়ে। এমনকি ক্ষমতায় আসবার পর তারা সাধারণ ক্ষমা’ও ঘোষণা করেছে সাধারণ জনগণের প্রতি।কিন্তু দৃশ্যপট আমাদের চোখের সামনে থেকে চোখের ঠুলি সরে যাওয়ার মতো ঠিক তখনই সরে যায় যখন তা’লেবানরা পশ্চিমা বিশ্বের ম’দদ পায়। তুরস্ক, চীন, রাশিয়া, পা’কিস্তান এরমাঝেই তাদের সাথে কাজ করার এবং গভীর বন্ধুত্ব তৈরি করার কথা বলে দিয়েছে। ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসনের কথাকে তোয়াক্কা না করে আন্তর্জাতিক মহল এখন বলতে গেলে তা’লেবানের প্রতি একটু হলেও নমনীয় হচ্ছে। এমনকি মা’র্কিন প্রশাসন বলছে যে যদি তারা শর্ত মেনে নেয়, তাহলে তা’লেবানদের স্বীকৃতি দিতে কোনো আ’প’ত্তি নেই।

বিশ্বের অ’পরাপর দেশগুলোর দিকে আম’রা তাকাই, যেখানকার খবর স’ম্প’র্কে কিছু জানতে পারি না। আম’রা জানতে পারি না উত্তর কোরিয়ায় কিম জং উন কীভাবে তার দেশ চালাচ্ছে, আন্তর্জাতিক পটভূমিতে ই’রানের খবরাখর খুবই ধোঁয়াশাময়। ই’রানের রাজনীতিতে প্রতিনিয়ত কী ঘটছে, তা আম’রা দেখতে পারি না। এমনকি চীনের কথাই ধ’রা যাক। ক’রো’না মহামা’রীতে কতজন মা’রা গিয়েছে, কতজন সংক্রমিত হয়েছে, দেশটির বর্তমান অবস্থা কি, সে স’ম্প’র্কে আম’রা কিছুই জানি না। বিশ্বের অন্যতম ক্ষমতাধর রাষ্ট্র যেন নিজেদের ব্যাপারে জানান দিতে একেবারেই চায় না। তা’লেবানরাও কি এমন একটি পন্থা অবলম্বন করতে যাচ্ছে কিনা, সেটিও আমাদের দেখার বিষয়।

সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে, তা’লেবানরা এখন পর্যন্ত বেশ কিছু ঘোষণা দিয়েছে, যেগুলো শুনলে মনে হবে যে আগের চেয়ে তারা অনেক বেশি নমনীয় এবং নিজেদের পরিকল্পনা স’ম্প’র্কে ওয়াকিবহাল। আম’রা কি এটাই ধরে নিতে পারি না যে এসব ঘোষণার মধ্য দিয়ে তা’লেবানরা আদতে বিশ্বমঞ্চের স্বীকৃতি আদায় করে নিতে চাইছে এবং পরবর্তীতে তারা তাদের মুখোশ উন্মোচন করবে? মোল্লা আবদুল গনি বারাদারসহ অন্যান্য শীর্ষ নেতারা কাতারের দোহা থেকে মাত্র আ’ফ’গা’নিস্তানের মাটিতে এসে পৌঁছেছেন। তারা এখন কী করবেন, কী বলবেন, সেদিকে তাকিয়ে আছে পুরো বিশ্ব। বৈশ্বিক সন্ত্রাসবাদ মা’থাচাড়া দেয়ার পেছনে তা’লেবানের এই নয়া উত্থান যে নতুন করে মা’থাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়াবে, সেটি তো আর বলার অ’পেক্ষা রাখে না।

আন্তর্জাতিক