fbpx

Desh Amar

Online news Portal

যখন সূর্য থাকবে তখন দিন। যখন সূর্যের দেথা মিলবে না তখন রাত। সূর্য উঠবে, সূর্য অস্ত যাবে, এ যেন চিরন্তন প্রবৃত্তি। পৃথিবীতে সময়কে পরিমাপ করা হয় ২৪ ঘণ্টায় একদিন হিসেবে। ১২ ঘণ্টা সূর্যালোক আর ১২ ঘণ্টা রাত। আলো আর আঁধারের এই সমন্বয়কে মেনে নিয়েই মানুষের দৈনন্দিন জীবনের স্বাভাবিক কার্যক্রম। কিন্তু পৃথিবীর সব জায়গাতেই দিন ও রাত সমান নয়।
জেনে অবাক হবেন এই পৃথিবীতে এমনও স্থান রয়েছে যেখানে টানা ৭০ দিনেরও বেশি সময় ধরে সূর্যাস্ত যায় না। কল্পনাকেও হার মানানো এইসব জায়গাতে স্থানীয় লোকেরাও দিন ও রাতের হিসাবে গোলমাল করে ফেলে। ভ্রমণ পিপাসু ব্যক্তিরা এইসব স্থানে গিয়ে একপ্রকার দিশেহারা হয়ে পড়েন। নরওয়ে দেখা যাবে এই দৃশ্যপট। যেখানে টানা ৭৬ দিনেও সূর্যাস্ত হয় না। আজ আপনাদের সে দেশের গল্পই বলছি।

উত্তর গোলার্ধের সুমেরুবৃত্তে অবস্থিত নরওয়েকে বলা হয় নিশীত সূর্যের দেশ। মে মাস থেকে শুরু করে জুলাই মাসের শেষ পর্যন্ত প্রায় টানা ৭৬ দিন এই অঞ্চলে সূর্য ডোবে না। এই সময় প্রতিদিন প্রায় ২০ ঘণ্টা এই দেশের প্রায় সব স্থানে ঝকঝকে সূর্যের আলো দেখা যায়। বাকি সময়টায় আলো তেজ কমে গেলেও দিগন্তে সূর্যের অবস্থানের কোনো পরিবর্তন হয় না। এই কারণেই দেশটির নামকরণ হয় ‘নিশীত সূর্যের দেশ’।

নরওয়ে এবং ইউরোপের সর্ব উত্তরে মানুষের বসবাসের স্থানের নাম ‘সাভালবার্ড’। এখানে এপ্রিলের ১০ তারিখ থেকে আগস্টের ২৩ তারিখ পর্যন্ত বিরতিহীন দিনের আলো দেখা যায়। স্থানীয়রা এই প্রাকৃতিক বিষয়ের সঙ্গে নিজেদের মানিয়ে নিয়েছে। তবে, দর্শনার্থীরা প্রায়শই দীর্ঘ সময় আলোতে থাকার কারণে ক্লান্তি, নিদ্রাহীনতা এবং সময়কেন্দ্রিক বিভ্রান্তিতে পড়ে থাকে।

নরওয়ে বছরের আট মাস বরফের নিচে ঢাকা থাকে। বছরের দুই মাস এখানে সূর্য ওঠে না। নভেম্বরের ২১ তারিখ থেকে জানুয়ারির ২১ তারিখ পর্যন্ত সময়টাকে তাই ডার্ক পিরিয়ড বলা হয়। এই সময় আকাশে নর্দার্ন লাইট বা অরোরা বুরিয়াল দেখা যায়। আকাশে লাল, সবুজ রঙের আলোর খেলা। এই অরোরা দেখতে অনেক পর্যটক এই সময়ে এখানে আসেন। আর বছরের দুই মাস এখানে আবার সূর্য অস্ত যায় না। মে মাসের ২১ তারিখ থেকে জুলাইয়ের ২১ তারিখ। এই সময়টাকে বলা হয় মিডনাইট সানের সময়। প্রাকৃতিক এই ঘটনাটিকে হোয়াইট নাইট বা শ্বেতরাত্রি বলেও উল্লেখ করা হয়। একটানা সূর্যের আলো বিদ্যমান থাকে এবং রাতের অন্ধকারের পরিবর্তে আকাশে গোধূলির আলো ফুটে থাকে। সত্যি অদ্ভুত জায়গা। তবে সামারের সময় যদি আবহাওয়া ভালো থাকে তাহলে এখানকার প্রকৃতি এক অদ্ভুত সৌন্দর্য ধারণ করে। চোখ ধাঁধান সুন্দর।

শুধুই কি মধ্যরাতে সূর্য দেখতেই নরওয়ে যাবেন? আরো আছে অনেক বিষয়। দেশটি ছবির চেয়ে সুন্দর। পরিস্কার ও পরিচ্ছন্ন দেশ। সবাই যেন শান্তির সঙ্গে বন্ধুত্ব করেই চলছে। কোথাও কোন অপরাধের দেখা পাওয়া ভার। মানুষগুলো শান্ত ও খুবই মানবিক। একে অপরের সাহায্যে এগিয়ে চলাই যাদের দিনান্তের ঘটনা। বিশ্বে শান্তির দেশের মধ্যে এ দেশটি সবার সেরা। নরওয়ে বিশ্বের সবচেয়ে শান্ত জনপদ। দীর্ঘায়ু, শারীরিক সুস্থতা, ব্যক্তি স্বাধীনতা এবং সামাজিক সহায়তার জন্য জনগণ শান্তির আধারে বাস করেন। এ ছাড়াও নরওয়ের অপরাধ প্রবণতা একেবারে কম এবং এই দেশটি জীবন ধারনের জন্য নিরাপদ।

নিশীত সূর্যের দেশ নরওয়ে। ছবি : সংগৃহীত

সুন্দর প্রকৃতি, প্রচুর অর্থ নরওয়ের। এখানে অভিযোগ করার কিছু নেই। নরওয়ে বললে নোবেল শান্তি পুরস্কারের কথাও মনে আসে। রাজধানী অসলোতে রয়েছে ‘নোবেল পিস সেন্টার’৷ সেখানে শান্তিতে নোবেলজয়ীদের বিশেষভাবে স্মরণ করা হয়। অসলোর গ্র্যান্ড হোটেলের ঝুল বারান্দায় দাঁড়িয়ে দর্শকদের অভিনন্দন গ্রহণ করেন নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ীরা। আপনি যদি অভুক্ত হন এবং টাকা না থাকে তাহলে যে কোন খাবারের দোকানে গেলেই খাবার পাবেন। কেননা আপনার খাবারের দাম আগেই অন্য একজন মিটিয়ে গেছেন। অথচ আপনার সঙ্গে তার পরিচয় নেই। কোন দিন মুহূর্তের জন্য দেখাও হয়নি। এই দৃশ্য অহরহ দেখতে পাবেন বিভিন্ন রেস্তোরায়।

প্রতি বছর হাজার হাজার পর্যটক এই পরাবাস্তব দৃশ্য অবলোকন করতে নরওয়েতে আসে। বিশ্বজুড়ে স্ক্যান্ডিনেভিয়ান এই দেশটির পরিচিতি মূলত মধ্যরাতের সূর্যের দেশ হিসেবে থাকলেও এটি ছাড়াও এই দেশটির বিশেষত্ব হিসেবে রয়েছে এর বিস্ময়কর প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্য। রুপকথার গল্পের মত সুন্দর সব সমুদ্রখাত, অরোরা বোরিয়ালিস বা উত্তরের আলো, তুষার ঢাকা বিস্তৃত মালভুমি আর অবিশ্বাস্য সুন্দর সব পর্বতমালা।

নরওয়ের প্রাণী বৈচিত্র্য অসাধারন এবং অবিশ্বাস্য। এখানে রয়েছে তুষার শুভ্র সুমেরু শিয়াল থেকে শুরু করে বল্গা হরিণ, তিমি, সাদা লেজ যুক্ত ঈগল, মেরু ভালুক, সিন্ধু ঘোটক এবং আরও অনেক ধরনের প্রাণী। আর্কটিক ল্যান্ডস্কেপ, উত্তরে বনাঞ্চল আর জটিল উপকূল ভূমির কারণে উত্তর নরওয়েতে সবচেয়ে বৈচিত্র্যময় বন্যপ্রাণী দেখতে পাওয়া যায়। নরওয়ের সর্ব উত্তরে সুমেরু বৃত্তের নিকট অবস্থিত সালবার্ড দ্বীপপুঞ্জে প্রায় ৩০০০ শ্বেত ভালুক রয়েছে। এছাড়াও সালবার্ড এ সিন্ধু ঘোটক দেখতে পাওয়া যায় যা ইউরোপের অন্য কোনো স্থানে দেখতে পাওয়া দুষ্কর। এগুলোকে প্রায়ই ফিয়র্ড এর তীরে দেখতে পাওয়া যায়, যা দর্শনার্থীদের জন্য এক অনন্য অভিজ্ঞতা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *